বাংলাদেশের সমগ্র ভূ-ভাগ যেমন নানা বৈচিত্রের সুষমায় সুশোভিত, ১৮৬৭ সালে প্রশাসনিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ফুলবাড়ীয়া থানাও (বর্তমানে উপজেলা) প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নানা বৈচিত্রে সুষমামণ্ডিত। এখানেও রয়েছে কিংবদন্তি ও নানা জনশ্রুতি আবহমান বাংলার অপরূপ সংস্কৃতি। পুরাকীর্তির নিদর্শন হিসাবে আনরাজার তৈরী আনই নদীর সুগভীর স্বচ্ছ জলরাশি এখনও সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। রাধাকৃষ্ণের নিষ্কাম প্রেমের লীলাক্ষেত্র কোটি কোটি হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থভূমি গুপ্ত বৃন্দাবন যুগ যুগ ধরে পরিচিত হয়ে আসছে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে। গুপ্ত বৃন্দাবন সাধারণ মানুষের নিকট গুপ্ত থাকলেও প্রকৃত প্রেমিকের নিকট একেবারে উন্মুক্ত। তাছাড়া রয়েছে ভাই-বোনের দীঘির এক অপূর্ব পৌরাণিক কাহিনী। আর ফুলবাড়ীয়ার রাঙ্গামাটিয়া-নাওগাঁও এলাকার বিখ্যাত বড়বিলার "নবাইকুরির" যে কিংবদন্তি বা জনশ্রুতি রয়েছে তা আমরা কয়জনই বা খবর রাখি। নবাইকুরির অনেক জনশ্রুতি রয়েছে, রয়েছে অনেক কিংবদন্তি। কিন্তু কেউ এর সঠিক তথ্য এবং তত্ত্ব কোনটাই উদঘাটন করতে সক্ষম হন নি কিংবা উদঘাটন করার প্রয়াস পান নি। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ভূতত্ত্বের অনেক উন্নতি ও অগ্রগতির যুগেও নবাইকুরির রহস্য রহস্যই থেকে যাচ্ছে। এই কুরির রহস্য যদি রহস্যই থেকে যায় তাহলে হয়তো একদিন এই রহস্যের আবরণে আবৃত হয়ে পড়বে রহস্যময় নবাইকুরি। তখন এই জনশ্রুতি বা কিংবদন্তী বিলীন হয়ে পড়বে।
বিলের আকৃতি বা আয়তনের জন্য হয়তো বড়বিল বা বড়বিলা নামকরণ হয়েছে। কিন্তু বড়বিলার নবাইকুরির নামকরণ কিজন্য হয়েছে তা কেউ সঠিক বলতে পারেন না। অনেকের মতে বড়বিলার অনেক কুরি রয়েছে। তারমধ্যে নবাইকুরি সবচেয়ে উলেখযোগ্য। এই কুরির তলদেশ থেকে নাকি সর্বদাই ঝর্ণা প্রবাহিত হয়ে থাকে যার ফলে শুকনো মৌসুমেও প্রচুর পানি থাকে। এখানে কোন আগাছা বা শেওলা জন্মায় না। প্রায় তিনশত বর্গফুট এলাকা জুড়ে এই কুরি অবস্থিত। এই কুরির পানি অত্যন্ত পরিস্কার এবং স্বাচ্ছ। এই কুরির পানি কখনও কেউ নোংরা হতে দেখেনি। এই কুরির গভীরতা যে কত আজ পর্যন্ত কেউ নির্ণয় করতে পারেন নি। অনেক লম্বা রশির একপ্রান্তে ইট বেঁধে কুরিতে ছেড়ে দিয়েও এর গভীরতা নির্ণয় করা যায়নি। এমনকি অনেকগুলি লম্বা বাঁশ একটার পর একটা জোড়া দিয়ে এই নবাইকুরিতে ঢুকিয়েও কেউ নিরূপণ করতে পারেন নি ইহার তলদেশ কোথায়।
জনশ্রুতি আছে অনেক আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ভাল ফল লাভের উদ্দেশ্যে এই নবাইকুরিতে মানসিক (মানত) করতেন। ভাল ফল পাওয়ার পর তারা সেই মানসিক করা পাঁঠা, কবুতর কিংবা অন্যান্য সামগ্রী নবাইকুরিতে বিসর্জন দিতেন। বিসর্জন দেওয়া সেই পাঁঠা, কবুতর, ফুল, বেলপাতা, তুলসী পাতা ইত্যাদি আঠারচূড়া বিলে ভাসতে দেখা যেতো। অনুরূপভাবে আঠারচূড়া বিলের একধারে পাঁঠা, কবুতর বা অন্যান্য কিছু মানসিক হিসাবে নিবেদন করলে নবাইকুরিতে ভাসতে থাকতো। আঠারচূড়া বিল বড়বিলা থেকে অন্তত ৭/৮ মাইল পশ্চিম দিকে অবস্থিত ঘাটাইল উপজেলার অন্তর্গত। আঠারচূড়াও একটি বড় ধরনের বিল। আঠারচূড়া বিলের আরেকধারে অপর একটি বড় ধরনের বিল রয়েছে তার নাম নেদারচূড়া। এই দুটি বিলে বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে অনেক দূর দূরান্তের চতুর্দিকের মানুষ দল বেঁধে এসে (বাওয়া বাইত) মাছ ধরতো। শিঙ্গা ফুকিয়ে ফুকিয়ে মানুষ একত্র হয়ে বিলে নামতো এবং মনের আনন্দে মাছ শিকার করতো। খুব বেশী দিন আগের কথা নয়। ঘাট/সত্তর দশক থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও অনেক বছর পর্যন্ত দল বেঁধে মানুষ মাছ ধরতে যেতো এবং প্রচুর মাছ ধরে নিয়ে আসতো। ছোট বড় বহু প্রকারের বহু ধরনের মাছ। আমরা স্বচক্ষে দেখেছি আমাদের বাড়ী, বাড়ীর আশে পাশের গ্রাম থেকে প্রতিবছর মাছ ধরতে গিয়েছে। এই মাছ আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে বিলানো হয়েছে। এই সময়টায় হাটে বাজারেও মাছের দাম কমে যেতো। শুধু আমাদের বাড়ী পাড়া বা গ্রাম নয় পার্শ্ববর্তী সকল গ্রাম। এমনকি সমগ্র ফুলবাড়ীয়া, পার্শ্ববর্তী ত্রিশাল থানার একাংশ মুক্তাগাছা থানার অর্ধেকাংশ এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ী থেকেই কমবেশী মানুষ মাছ ধরতে যেতো সেই ঐতিহাসিক বিল দু'টিতে। সুযোগ বুঝে বাড়ীতে পুরুষ লোক কম থাকায় চোরের দল কোন কোন বাড়িতে চুরি করতে আসতো। এ ধরনের কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে এটা জেনেও মানুষ মাছ শিকার করার লোভ সংবরণ করতে পারতো না। দল বেঁধে, হইহুলোর করে গান গেয়ে মাছ ধরার অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে বের হয়ে পড়তো। তাছাড়া নিয়ে যেতো চাল, কিছু তরকারী, মরিচ, মশলা, মাছ কুটার দা, বটি, রান্না করার লাকড়ী ইত্যাদি। ৩/৪ দিন এমনকি তার চেয়ে বেশী দিনের প্রস্তুতি নিয়ে যেতো বিলের পাড়ে টাটকা মাছ রান্না করে খাওয়ার জন্য। কেউ কেউ সাইকেলে গিয়ে ২/১ বার মাছ নিয়ে আসতো।
মনে হতো এটা এক বিশাল পর্ব। বিশাল আনন্দ। দলবেঁধে মাছ ধরতে যাওয়ার আনন্দ, বিলের পানিতে নেমে মাছ ধরার আনন্দ, সর্বোপরি মাছের ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে বাড়ী ফেরার আনন্দ। এটা ছিল এই এলাকার একটি কৃষ্টি বা সংস্কৃতি অথবা বলা যায় লোক সংস্কৃতি বা লোক কাহিনী আবহমান বাংলার এক অপরূপ সংস্কৃতি, এই দু'টি বিলে যথাক্রমে আঠারচূড়া ও নেদারচূড়ায় মাছ শিকারের জন্য সারা বছর মানুষ ছোট বড় নানা ধরনের জাল-জালি, খাঁচি ইত্যাদি তৈরী করে প্রস্তুতি নিতে ও পরিকল্পনা করতে থাকতো। পরিকল্পনা করতো চোরের ভয়ে কোন আত্মীয় স্বজনকে মাছ ধরার সময়টায় বাড়ীতে রেখে যাওয়া যায় কিনা। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকতো কবে আসবে সেই মাছ শিকারের শুভ দিন, শুভক্ষণ।
যাহোক-ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে ফেললাম। কিংবদন্তীতে ফিরে আসি আরেকবার। কিংবদন্তী আছে-নবাইকুড়ি এলাকার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন পূজা পার্বণ, বিবাহ, অন্নপ্রাশন, কিংবা অন্য কোন বড় উৎসবে বেশী পরিমাণে বাসনপত্রের প্রয়োজন হলে এই কুরির পাশে বসে প্রার্থনা করলেই প্রয়োজনীয় বাসন যেমন ডেগ, ডেস্কি (ডেগচি), থালা, জগ, গামলা, কলসী, বাটি ইত্যাদি পাওয়া যেতো। অনুষ্ঠান শেষে আবার ফেরৎ দিতে হতো। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে আবার সেই বাসনগুলো মানুষ ফেরৎ দিতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মানুষ ছল-ছাতুরী বা অসততার আশ্রয় নিতে থাকে। লোভ সংবরণ করতে পারেনা। ফেরৎ দেওয়ার সময় দু'চারটি পছন্দমত রেখে দিতো। তারপর থেকে নাকি আর কেউ অনেক প্রার্থনা ও কাঁদাকাটি করেও কোন ভালো বাসন দূরে থাকুক একটি ঘটিও পায়নি।আবার জনশ্রুতি বা কিংবদন্তী আছে মাছ ধরতে গিয়ে বা অন্য কোন কাজে গিয়ে বড়বিলার সেই নবাইকুরিতে প্রতিবছর ২/১ জন লোক মারা যায়। গত বছরও নাকি একজন ছেলে বয়সী এবং একজন বয়স্ক লোক মারা গিয়েছে। সংস্কৃত ভাষার উৎসমূল থেকে 'কিংবদন্তী' শব্দটি আধুনিক বাংলাভাষায় এসেছে। সংস্কৃত ব্যাকরণে কিম্+বদন্তি সন্ধির ফলে "কিংবদন্তী" শব্দটি হয়েছে যার প্রতিশব্দ জনশ্রুতিও বলা হয়ে থাকে। লোককথা (Folklore), রূপকথা (Fairytale). প্রবাদ (Proverbs), লোক সংস্কার (Superstition), কিংবদন্তী (Legends) ইত্যাদি সকলই লোক কাহিনী ও লোক সাহিত্যের অন্তর্ভূক্ত। বড়বিলার নবাইকুরি কিংবদন্তী হিসাবে লোক সাহিত্যের একটি আধার হয়ে উঠুক এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির যুগে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ভূতত্ত্ববিদদের ছোঁয়ায় এবং পৃষ্ঠপোষকতায় নবাইকুরির রহস্য উন্মোচিত হোক ব্যক্তিগতভাবে আমার এবং আমাদের একান্ত প্রত্যাশা। জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে এলাকার মানুষের একান্ত ইচ্ছা নবাইকুরির রহস্য উন্মোচিত হোক এবং শাশ্বত বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক হিসাবে মানুষের নিকট পরিচিতি লাভ করুক।সূত্র: ত্রিমাসিক সাহিত্যপত্র আখিলা
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: ড. জাহাঙ্গীর আলম || নির্বাহী সম্পাদক: মেহেদী কাউসার ফরাজী
অফিস: মেইন রোড, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ | মোবাইল: ০১৯৭৯ ৮০৯ ৬৮৮ | ইমেইল: fulbariapratidin@gmail.com | ©২০১৬-২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত