দক্ষিণ পশ্চিম ময়মনসিংহের এক পশ্চাৎপদ জনপদের নাম ফুলবাড়ীয়া। যার আয়তন ৩৯৯ বর্গ কিলোমিটার। এ আয়তনকে নেহায়েত ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। কারণ এর চেয়ে আয়তনে অনেক ছোট ভূখণ্ডও পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নাউরু ২১ বর্গ কিঃমিঃ, তুভালু ২৬ বর্গ কিঃমিঃ, সান মারিনো ৬২ বর্গ কিঃমিঃ, সেন্ট ক্রিস্টোফার নেভিস ২৬১ বর্গ কিঃমিঃ, মালদ্বীপ ২৯৮ বর্গ কিঃমিঃ, বার্বাডোস ৪৩১ বর্গ কিঃমিঃ, এন্ডোরা ৪৪৬ বর্গ কি:মি:, সিঙ্গাপুর ৬১৯ বর্গ কিঃমিঃ, বাহরাইন ৬২২ বর্গ কিঃমিঃ, কিরিবাতি ৬৮৯ বর্গ কি:মি: আয়তন বিশিষ্ট দেশ গুলির অনেক গুলিই ফুলবাড়ীয়ার আয়তনের চেয়ে অনেক ছোট। আর যে গুলোর আয়তন ফুলবাড়ীয়ার চেয়ে বড় সেগুলোও সাবেক ফুলবাড়ীয়ার (যে তিনটি ইউনিয়ন পার্শ্ববর্তী উপজেলা ত্রিশালের সাথে যুক্ত হয়েছে সেগুলি সহ) আয়তনের প্রায় সমান। যে প্রাণীকূল, সভ্যতা গড়ার নির্মাতা কারিগর তাদের সংখ্যাও কোন মতেই নগণ্য নয়। প্রায় পাঁচলক্ষ। উলেখিত রাষ্ট্র তো বটেই এ ছাড়াও পৃথিবীতে আরো অনেক স্বাধীন দেশ রয়েছে যার জনসংখ্যা ফুলবাড়ীয়া উপজেলার জনসংখ্যার চেয়ে কম। এত আয়তন এবং জনসংখ্যা অধ্যুষিত এজনপদের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি নিশ্চয়ই অল্পদিনের নয়- হতে পারে শত শত অথবা হাজার হাজার বছরের পুরোনো। ইতিহাসের নেকনজরের অভাবে এ জন পদের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য কৃষ্টি সংস্কৃতি সবই কালের গহব্বরে লুপ্ত হয়েছে অথবা গুপ্ত রয়েছে। এ লুপ্ত বা গুপ্ত সম্পদ উদ্ধার সত্যি কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।
পৃথিবীর প্রতিকূল অনুকূল হরেক কিসিমের প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার প্রয়োজনে অগ্রসর হয় মানুষ। আর মানুষের এ অগ্রগতিকে পায়ে পায়ে শৃঙ্খলিত করার জন্য আসে হরেক কিসিমের ব্যবস্থা। আসে জাত, পাত, ধর্ম, বর্ণ, শাসন শোষণ। ভূ হয় খন্ড। প্রতিষ্ঠা হয় প্রশাসন। সৃষ্টি হয় মানুষের ভূখণ্ড ভিত্তিক খণ্ডিত ইতিহাস। এ খণ্ড খণ্ড ইতিহাসই সৃষ্টি করে মানুষের সামষ্টিক ইতিহাস। অর্থাৎ মানুষের ইতিহাস। আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস সামষ্ঠিক মানুষের ইতিহাস নয় শুধু মাত্র ফুলবাড়ীয়া জনপদের ইতিহাস প্রতিপাদন করা।
কোন প্রভাব প্রতিপত্তির ক্ষমতাবলে ফুলবাড়ীয়ার সীমা নির্ধারিত হয়েছিল যার উপর ভিত্তি করে ১৮৮৪ সালে ফুলবাড়ীয়া থানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ জনপদে রয়েছে হাজার বছরের পুরানো লোক-কথার জ্যান্ত নিদর্শন। ফুলবাড়ীয়ার সীমান্ত ছোঁয়ে সনাতন ধর্মের অবতার শ্রী কৃষ্ণের কথিত লীলা ভূমি গুপ্ত বৃন্দাবনের তমাল বৃক্ষ, আনই রাজার বাড়ী বেষ্টিত বন্ধ নদী, লোকমুখে সালহীন সময়ের ইতিহাস ঐতিহ্য বহন করে চলছে। এ সব নিদর্শিত লোক কাহিনীর সত্য প্রতিপাদন করার উদ্যোগ এখনো কোন নৃ-বিজ্ঞান বা ইতিহাস গবেষকের আমলে আসেনি। সালহীন সময়ের গন্ডি পেরিয়ে আমরা যদি সালের পথবেয়ে অগ্রসর হই এপথেও আমরা দেখতে পাই অনেক স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন স্বরূপ কয়েক শতক আগের কয়েকটি মসজিদ, মন্দিরের মত স্থাপনা। মাত্র কয়েক শতক আগে হলেও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে স্থাপনা সমূহের প্রকৃত ইতিহাস। একটি সমৃদ্ধ ফুলবাড়ীয়া গড়ার জন্য প্রকৃত ইতিহাস উদ্ঘাটন অত্যন্ত অপরিহার্য।
সারা দুনিয়াব্যাপী আজ যে একাডেমিক শিক্ষা একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তার করে আছে, তার আবির্ভাব ফুলবাড়ীয়াতে খুব বেশীদিন আগের নয়। ফুলবাড়ীয়া থানা সদরে যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি তা স্থাপিত গত শতকে ১৯৩৮ সালে, মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে ১৯৭১ সালে। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলিও স্থাপিত হয়েছে এ উনিশ শতাব্দীতে। তাহলে কী এর আগে এ অঞ্চলে কোন শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলনা? হয়ত ছিল। সেটা হতে পারে একান্তই ধর্মীয় শিক্ষা। যে শিক্ষার মাধ্যমে শুধু পরলৌকিক ধ্যান ধারণা সুখ ভোগের লোভই অর্জিত হয়েছে। হয়তবা পার্থিব জীবনাচার সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ শিক্ষা অর্জনের কোন প্রতিষ্ঠান বা গুরুগৃহ ছিলনা। যার দরুণ সৃষ্টি হয়নি মননশীল, বিজ্ঞানমনস্ক অন্বেষণী বোধ ও বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। যারা ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অক্ষরের ফ্রেমে বন্দিকরে কালের যাত্রায় পাঠিয়ে দিতে পারতেন অনন্ত ভবিষ্যতের ঠিকানায়। যে ঘাটতি পুরণ হবার নয় তার জন্য আক্ষেপ করে আমরা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবো? নাকি অতীত ঐতিহ্যের ধ্বংসাবশেষের উপর ভর দিয়ে গুপ্ত ইতিহাস ঐতিহ্য উদ্ধারে প্রত্যয়ি হবো? আসুন আমরা দ্বিতীয়টি বেছে নেই। আমাদের সকলের আন্তরিক প্রয়াসে বর্তমান, অতীত এবং ভবিষ্যৎ মিলিয়ে একটি সমৃদ্ধ ফুলবাড়ীয়ার স্বপ্ন বুনি।সূত্র: ত্রিমাসিক সাহিত্যপত্র আখিলা
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: ড. জাহাঙ্গীর আলম || নির্বাহী সম্পাদক: মেহেদী কাউসার ফরাজী
অফিস: মেইন রোড, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ | মোবাইল: ০১৯৭৯ ৮০৯ ৬৮৮ | ইমেইল: fulbariapratidin@gmail.com | ©২০১৬-২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত