ফুলবাড়ীয়া উপজেলা সদর হতে ৫ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে আখিলা নদীর তীরে ডাকাত ভিটা অবস্থিত। চারদিকে নিম্নাঞ্চল পরিবেষ্টিত উচু ভিটারমত জায়গাটার নাম ডাকাত ভিটা। যাকে ঘিরে প্রচলিত আছে ভিন্ন ভিন্ন লোককথা। প্রচলিত কাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনীটি এরকম- তিন চারশত বছর পূর্বে বন্যার সময় ভেলায় ভেসে এসে এক শিশু (মতান্তরে) শিশু সহ মহিলা আশ্রয় নেয় বর্তমান বরুকা গ্রামের কোনাপাড়ায়। সেখানেই কারও আশ্রয়ে বেড়ে উঠে সে। যার নাম ফকির আলী।
কিশোর বয়সে ফকির আলী এলাকার অন্যদের সাথে গরু কিনতে যায় পশ্চিমের কোন হাটে। যাওয়ার পথে মধুপুরের কোন এক এলাকায় রাস্তায় বিশ্রাম নেওয়ার সময় পরিচয় অশীতিপর বৃদ্ধর সাথে। এক পর্যায়ে বৃদ্ধ ফকির আলীকে বলে তোমার গরু কিনতে যেতে হবে না। তুমি আজ আমার এখানে থেকে যাও। বৃদ্ধর কথামত ফকির আলী থেকে যায় তার কাছে। কথা প্রসঙ্গে বৃদ্ধ লোকটি জানায়-তোমাদের বাড়ির পার্শ্বে যে ডাকাতের ভিটাটা রয়েছে, সেখানে অনেক সম্পদ আছে। ঐ সম্পদের তুমিই হকদার। আলাহ মনে হয় সম্পদের হকদার হিসেবেই তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে। বৃদ্ধ আরও বলে- ঐ ভিটায় তিনটি কাঠাল গাছ আছে। ভিটার উত্তর দিক হতে সরু রাস্তাদিয়ে ঢুকলে প্রথম যে কাঠাল গাছটি পড়ে ঐ গাছের গর্তে প্রচুর টাকা আছে। প্রথম গর্তের টাকা তুমি নিবে, অন্য গর্তের টাকা দিয়ে একটি মসজিদ করে দিবে এবং তুমি নিজে হজ্ব করবে। সেখান থেকে ফিরেই ফকির আলী তার মাকে নিয়ে প্রবেশ করে ডাকাত ভিটায় এবং পেয়ে যায় গুপ্তধন। সেই টাকায় ফকির আলী তৈয়ার করে একটি মসজিদ এবং নিজে হজু করে আসে। বাকী টাকা দিয়ে সম্পদ ক্রয় করে সে। ভিন্নমতটি এরকম- গরু কিনতে গিয়ে ফকির আলী হারিয়ে যায়। অন্য সবাই চলে আসলেও ফকির আলী পথের ধারে বসে কাঁদতে থাকে। এমন সময় ঐ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল একদল ডাকাত। তারা ফকির আলীর কাছে সব শুনে তার ঠিকানা জানতে চায়। ঠিকানা জানার পর তারা তাকে ডাকাত ভিটার ঐ কাঠাল গাছটির সন্ধান দেয় এবং ঘোড়ায় করে তাকে পৌঁছে দেয় তার বাড়ির কাছাকাছি কোন এক জায়গায়। টাকা নেওয়ার শর্ত ঐ একই।
যে কাঠাল গাছটিকে নিয়ে গল্প সেটি জ্বিনের দখলে আছে এটাই ছিল পূর্বেকার মানুষের বিশ্বাস। এমন কথাও প্রচলিত আছে যে ঐ গাছের ডাল কাটতে গিয়ে অনেকেই মৃত্যু বরণ করেছে।মধুপুরের বিভিন্ন এলাকায়। ইতিহাসবিদদের মতে তৎকালীন সন্ন্যাসীরা নাম
পরিবর্তন করে বিভিন্ন জনপদে আশ্রয় নিয়ে লুটপাট চালাতো। এদেরই কোন দল হয়ত আশ্রয় নিয়েছিল দুর্গম এ ভিটায়। তারপর থেকেই হয়তো ঐ ভিটার নাম ডাকাত ভিটা। তারাই হয়ত টাকা পয়সা জমিয়েছিল ঐ কাঠাল গাছের গর্তে। ভেলায় ভেসে আসার গল্পটুকু বাদ দিলে কোন কারণে নিহত ডাকাতের বিধবা স্ত্রী সন্তানসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী গ্রামে, আর ভেসে আসার গল্পটুকু ছিল আশ্রয় পাওয়ার স্বার্থে বানানো। ফকির আলীর গরু কিনতে যাওয়ার গল্প এবং সেখানে বৃদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। কারণ পূর্বেই বলা হয়েছে ছত্রভঙ্গ ফকির সন্যাসীরা মধুপুরের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল।
বর্তমান অবস্থা
আজ থেকে ৬০/৭০ বছর পূর্বেও ডাকাত ভিটা কোন মানুষের বাস ছিল না, ছিল জঙ্গলাকীর্ণ উচু ভূমি। ডাকাত ভিটায় প্রথম বাসস্থান নির্মাণকারী মোসলেম উদ্দিন বলেন তাকে ছাড়াও বর্তমানে ৮/১০টি পরিবার ওখানে বাস করে। এখানে একটি ঈদগাহ মাঠ আছে, সম্পূর্ণ ভিটাই এখন মানুষের লাগানো একাশি, মেহগণি সহ বিভিন্ন গাছে পরিপূর্ণ। দুই/তিন বছর পূর্বে রহস্যজনক ভাবে আগুন লাগে ঐতিহাসিক কাঠাল গাছটিতে। আগুন লাগার পরও বেঁচে আছে গাছটি। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আখিলা নদী এখন মৃতপ্রায়।
বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো লোক কাহিনীর অংশ হয়ে বেঁচে আছে ডাকাত ভিটা ও কাঠাল গাছটি। আরও কিছুদিন হয়তো বেঁচে থাকবে কাঠাল গাছটি। এক সময় কালের গর্ভে গাছটির সাথে হারিয়ে যাবে কাহিনীটিও।সূত্র: ত্রিমাসিক সাহিত্যপত্র আখিলা
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: ড. জাহাঙ্গীর আলম || নির্বাহী সম্পাদক: মেহেদী কাউসার ফরাজী
অফিস: মেইন রোড, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ | মোবাইল: ০১৯৭৯ ৮০৯ ৬৮৮ | ইমেইল: fulbariapratidin@gmail.com | ©২০১৬-২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত