ফুলবাড়ীয়া ১১:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ড. জাহাঙ্গীর আলমের একান্ত সাক্ষাৎকার

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা আজ এক বিশেষ একান্ত সাক্ষাৎকারের আয়োজন করেছি ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার গবেষক ও লেখক ড. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। ড. আলম দীর্ঘ দশ বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি কবির জন্মস্থান বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে নজরুল জন্মবার্ষিকী উদযাপন এবং ময়মনসিংহ জেলার নজরুল স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালের দরিরামপুরে আয়োজিত জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠান নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই দুই প্রেক্ষাপট থেকে তিনি আমাদের সঙ্গে তার গঠনমূলক ও প্রাঞ্জল অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ এবং অন্তর্দৃষ্টি শেয়ার করবেন। চলুন শুনি ড. জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে তার গবেষণা ও সরাসরি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে নজরুলের প্রতি অমলিন ভালোবাসা ও সম্মানকে কেন্দ্র করে তার মূল্যবান কথাগুলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন রানা মন্ডল। পঞ্চম পর্বের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব

প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘ ১০ বছর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। বর্ধমানের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আপনার যে সংযোগ গড়ে উঠেছে, সেটি কেমন ছিল?

উত্তর (ড. জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে):
“বর্ধমান আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। গবেষণার প্রয়োজনে আমি সেখানে দীর্ঘ ১০ বছর কাটিয়েছি, কিন্তু শুধু গবেষণা নয়, বর্ধমানের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি—সব কিছুই আমার হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। বর্ধমানের মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ। একাডেমিক পরিবেশে যেমন পেয়েছি সহায়ক অধ্যাপক ও সহপাঠী, তেমনই সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও পেয়েছি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আপ্যায়ন।

বিশেষ করে চুরুলিয়া গ্রামে গিয়ে আমি প্রথমবার কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভিটা দর্শন করি—সেই মুহূর্তটা আমার জীবনে অত্যন্ত আবেগঘন। স্থানীয় মানুষজন নজরুলকে যেভাবে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন, সেটি আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে নজরুল শুধু এক জন কবি নন, বরং তিনি এই অঞ্চলের আত্মার সঙ্গে মিশে আছেন।

এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা আমাকে বাঙালির দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সংযোগ, অনুভব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। আমি গর্বিত যে বর্ধমানের সঙ্গে আমার এমন একটি আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠেছে।”

প্রশ্ন: চুরুলিয়া গ্রামে নজরুলের জন্মস্থান ঘিরে আপনার প্রথম অনুভূতি কী ছিল?
উত্তর (ড. জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে):

“চুরুলিয়া গ্রামে প্রথমবার পা রাখার মুহূর্তটাই ছিল আমার জন্য গভীরভাবে আবেগঘন ও পরম গর্বের। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম সেই ধূলিমাখা পথ, যেখানে হেঁটে গেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম—বিদ্রোহের প্রতীক, মানবতার কণ্ঠস্বর। জন্মভিটায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, এই সাধারণ গ্রামই জন্ম দিয়েছিল এমন অসাধারণ একজন মানুষকে, যিনি কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, সমগ্র উপমহাদেশের বিবেক হয়ে উঠেছিলেন।

নজরুলের জন্মস্থানটি খুব যত্নসহকারে সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে নজরুল একাডেমি, স্মৃতিসৌধ, সংগ্রহশালা—সব কিছুই পরিপাটি ও শ্রদ্ধাভরে গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় মানুষদের মধ্যে নজরুলকে নিয়ে গভীর ভালোবাসা আর গর্বের অনুভূতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আমার মনে হয়, চুরুলিয়া কেবল নজরুলের শৈশবভূমি নয়—এটি তাঁর আদর্শ, চেতনা ও সাহসিকতার শিকড়।

আমি সেদিন মাটিতে বসে দীর্ঘক্ষণ ভাবলাম—এই ক্ষুদ্র একটি কুটিরে বেড়ে উঠেছিল এক বিপ্লবী মন, যে সাম্য, মানবতা, বিদ্রোহ ও ভালোবাসাকে একসঙ্গে গাঁথতে পেরেছিল কবিতার ভাষায়। এই অনুভূতি আমার গবেষণা জীবনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে আছে।”

প্রশ্ন: গবেষণার পাশাপাশি নজরুল-সংক্রান্ত কোনো প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত ছিলেন কি?

উত্তর (ড. জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে):
“অবশ্যই, গবেষণার পাশাপাশি আমি নজরুলচর্চায়ও সরাসরি যুক্ত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে, আমি নজরুলের জন্মভূমি চুরুলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত নজরুল একাডেমির আজীবন সদস্য। এই সদস্যপদ শুধু নামমাত্র নয়, এটি আমার কাছে এক ধরণের দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতা।

নজরুল একাডেমির উদ্যোগে প্রতি বছর যে জন্মজয়ন্তী উদযাপন, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়—আমি সেগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছি। আমার গবেষণা অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও সংলাপে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও পেয়েছি। আমার বিশ্বাস, নজরুল কেবল সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। তাঁর কর্ম ও দর্শনকে দুই বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। তাই গবেষণার বাইরেও নজরুলচর্চা আমার নৈতিক ও আত্মিক অঙ্গীকারের অংশ।”

ট্যাগ:
জনপ্রিয়

ফুলবাড়ীয়ায় জাতীয় প্রাণীসম্পদ সপ্তাহ উদ্বোধন

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ড. জাহাঙ্গীর আলমের একান্ত সাক্ষাৎকার

আপডেট: ০৯:৩৫:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ মে ২০২৫

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা আজ এক বিশেষ একান্ত সাক্ষাৎকারের আয়োজন করেছি ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার গবেষক ও লেখক ড. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। ড. আলম দীর্ঘ দশ বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি কবির জন্মস্থান বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে নজরুল জন্মবার্ষিকী উদযাপন এবং ময়মনসিংহ জেলার নজরুল স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালের দরিরামপুরে আয়োজিত জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠান নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই দুই প্রেক্ষাপট থেকে তিনি আমাদের সঙ্গে তার গঠনমূলক ও প্রাঞ্জল অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ এবং অন্তর্দৃষ্টি শেয়ার করবেন। চলুন শুনি ড. জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে তার গবেষণা ও সরাসরি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে নজরুলের প্রতি অমলিন ভালোবাসা ও সম্মানকে কেন্দ্র করে তার মূল্যবান কথাগুলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন রানা মন্ডল। পঞ্চম পর্বের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব

প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘ ১০ বছর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। বর্ধমানের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আপনার যে সংযোগ গড়ে উঠেছে, সেটি কেমন ছিল?

উত্তর (ড. জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে):
“বর্ধমান আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। গবেষণার প্রয়োজনে আমি সেখানে দীর্ঘ ১০ বছর কাটিয়েছি, কিন্তু শুধু গবেষণা নয়, বর্ধমানের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি—সব কিছুই আমার হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। বর্ধমানের মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ। একাডেমিক পরিবেশে যেমন পেয়েছি সহায়ক অধ্যাপক ও সহপাঠী, তেমনই সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও পেয়েছি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আপ্যায়ন।

বিশেষ করে চুরুলিয়া গ্রামে গিয়ে আমি প্রথমবার কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভিটা দর্শন করি—সেই মুহূর্তটা আমার জীবনে অত্যন্ত আবেগঘন। স্থানীয় মানুষজন নজরুলকে যেভাবে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন, সেটি আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে নজরুল শুধু এক জন কবি নন, বরং তিনি এই অঞ্চলের আত্মার সঙ্গে মিশে আছেন।

এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা আমাকে বাঙালির দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সংযোগ, অনুভব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। আমি গর্বিত যে বর্ধমানের সঙ্গে আমার এমন একটি আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠেছে।”

প্রশ্ন: চুরুলিয়া গ্রামে নজরুলের জন্মস্থান ঘিরে আপনার প্রথম অনুভূতি কী ছিল?
উত্তর (ড. জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে):

“চুরুলিয়া গ্রামে প্রথমবার পা রাখার মুহূর্তটাই ছিল আমার জন্য গভীরভাবে আবেগঘন ও পরম গর্বের। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম সেই ধূলিমাখা পথ, যেখানে হেঁটে গেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম—বিদ্রোহের প্রতীক, মানবতার কণ্ঠস্বর। জন্মভিটায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, এই সাধারণ গ্রামই জন্ম দিয়েছিল এমন অসাধারণ একজন মানুষকে, যিনি কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, সমগ্র উপমহাদেশের বিবেক হয়ে উঠেছিলেন।

নজরুলের জন্মস্থানটি খুব যত্নসহকারে সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে নজরুল একাডেমি, স্মৃতিসৌধ, সংগ্রহশালা—সব কিছুই পরিপাটি ও শ্রদ্ধাভরে গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় মানুষদের মধ্যে নজরুলকে নিয়ে গভীর ভালোবাসা আর গর্বের অনুভূতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আমার মনে হয়, চুরুলিয়া কেবল নজরুলের শৈশবভূমি নয়—এটি তাঁর আদর্শ, চেতনা ও সাহসিকতার শিকড়।

আমি সেদিন মাটিতে বসে দীর্ঘক্ষণ ভাবলাম—এই ক্ষুদ্র একটি কুটিরে বেড়ে উঠেছিল এক বিপ্লবী মন, যে সাম্য, মানবতা, বিদ্রোহ ও ভালোবাসাকে একসঙ্গে গাঁথতে পেরেছিল কবিতার ভাষায়। এই অনুভূতি আমার গবেষণা জীবনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে আছে।”

প্রশ্ন: গবেষণার পাশাপাশি নজরুল-সংক্রান্ত কোনো প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত ছিলেন কি?

উত্তর (ড. জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে):
“অবশ্যই, গবেষণার পাশাপাশি আমি নজরুলচর্চায়ও সরাসরি যুক্ত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে, আমি নজরুলের জন্মভূমি চুরুলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত নজরুল একাডেমির আজীবন সদস্য। এই সদস্যপদ শুধু নামমাত্র নয়, এটি আমার কাছে এক ধরণের দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতা।

নজরুল একাডেমির উদ্যোগে প্রতি বছর যে জন্মজয়ন্তী উদযাপন, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়—আমি সেগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছি। আমার গবেষণা অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও সংলাপে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও পেয়েছি। আমার বিশ্বাস, নজরুল কেবল সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। তাঁর কর্ম ও দর্শনকে দুই বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। তাই গবেষণার বাইরেও নজরুলচর্চা আমার নৈতিক ও আত্মিক অঙ্গীকারের অংশ।”