
লেখা:রব পিশেটা, মিশেল রিওস, হিরা হুমায়ুন
ইউক্রেন যুদ্ধের আলোকে ইউরোপ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। এই সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আলোচনার নেতৃত্ব নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন ইউরোপীয় নেতারা। লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একে ‘ইতিহাসের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সেই সঙ্গে শুধু আলোচনা নয়, বরং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান স্টারমার।
ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতারা ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির এক কৌশল নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। এই চেষ্টা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে ঘটে যাওয়া কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রতিক্রিয়ায় ত্বরান্বিত হয়েছে।
মার্কিন ও ইউক্রেইন প্রেসিডেন্টের মধ্যে এ বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র ভাষায় জেলেনস্কিকে আক্রমণ করেন। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় নেতারা নিজেদের ভূমিকাকে আরও সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেন। স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এবং আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ মিলে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের আশা, এ পরিকল্পনা গ্রহণ করলে যুদ্ধের উত্তেজনা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির ভিত্তি তৈরি হতে পারে। মাখোঁ ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে ফিগারোকে জানান, প্রস্তাবিত এ পরিকল্পনার প্রথম ধাপে এক মাসব্যাপী আকাশ, সমুদ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যুদ্ধবিরতি থাকবে। এরপর শুরু হবে স্থল পর্যায়ে আলোচনা।
এই ইউরোপীয় প্রচেষ্টা ট্রাম্পের রাশিয়ার সঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনাপ্রক্রিয়ার একটি বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প-পুতিন আলোচনায় ইউক্রেনের স্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে। তবে স্টারমার স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে এ–ও বলেছেন, পরিস্থিতি যা–ই হোক না কেন, ইউরোপ তার প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইউরোপীয় নেতারা নিশ্চিত করতে চান যে রাশিয়া যেন একতরফাভাবে কোনো চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করতে না পারে। তারা এ–ও নিশ্চিত করতে চান, সব আলোচনার কেন্দ্রে যেন থাকে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব।ইউরোপীয় দেশগুলোর এ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট’ গঠন। এই জোটের দেশগুলো একটি শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনের জন্য সামরিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করবে। স্টারমার জোর দিয়ে বলেন, কোনো চুক্তি হলে তা অবশ্যই কার্যকরভাবে রক্ষা করাও সমান জরুরি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এ সম্মেলনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইউরোপের ঐক্য বর্তমানে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতির সূচনা হওয়া উচিত মানবিক পদক্ষেপের মাধ্যমে। যেমন বন্দী বিনিময়, রাশিয়ার দ্বারা অপহৃত ইউক্রেনীয় শিশুদের ফিরিয়ে আনা ইত্যাদি। এ পদক্ষেপগুলোয় রাজি হলে তা রাশিয়ার শান্তির প্রতি সদিচ্ছার প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে।
এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন পশ্চিমা বিশ্বে বিভক্তির শঙ্কা বেড়েছে। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা জেলেনস্কিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করছেন। তাঁরা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অকৃতজ্ঞ বলে অভিহিত পর্যন্ত করেছেন। এ ঘটনায় ইউরোপীয় নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্টারমার দ্রুত ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইউক্রেনের প্রতি তাঁদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এই দ্রুত পদক্ষেপের প্রতিফলন দেখা যায় সম্মেলনের ফলাফলে। সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক আর্থিক ও সামরিক সহায়তা ঘোষণা করা হয়। যেমন যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের জন্য ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি আরও দুই বিলিয়ন ডলার মূল্যের উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য অর্থায়নের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে সম্মেলনে।
এদিকে ফরাসি নেতা মাখোঁ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে একতরফা যুদ্ধবিরতি–বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, এমন চুক্তি হলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তা ইউক্রেনকে দুর্বল ও অপমান করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন। তাই তিনি যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। জেলেনস্কি ইউরোপীয় উদ্যোগ সম্পর্কে সচেতন থাকলেও এ প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট সমর্থন এখনো প্রকাশ করেননি।
লন্ডনের এ সম্মেলন ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইউরোপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং বিভিন্ন দেশের নেতারা একত্র হয়ে পশ্চিমা বিশ্বে বিভক্তি এড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্বের বিভক্তি এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ চলতে থাকলে এ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোই ভবিষ্যতের পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে। ইউরোপের নেতারা উপলব্ধি করেছেন, এখন এমন এক সময়, যখন ইউরোপের নিরাপত্তাকাঠামো নতুন করে গড়ে তোলার কাজ করতে হবে। আর নিশ্চিত করতে হবে, ইউক্রেন যেন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। ইউরোপীয় এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বিশ্বশক্তির সমর্থন পাবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু অন্তত নিশ্চিত, ইউরোপ এখন আর ইউক্রেনের ভাগ্য নির্ধারণে আমেরিকার মুখ চেয়ে নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না।
- রব পিশেটা, মিশেল রিওস, হিরা হুমায়ুন সাংবাদিকসিএনএন থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ