
কলকাতা শহর তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, এবং সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ধারক। আমার জন্ম ময়মনসিংহে হলেও, ভারতের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার সুবাদে দীর্ঘ ১০ বছর কাটিয়েছি বর্ধমান শহরে। এই সময়ের মধ্যে কলকাতায় অসংখ্যবার যাওয়া-আসা হয়েছে, কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই মনে হলো—কলকাতার ঐতিহাসিক হাতে টানা রিকশায় চড়ার অভিজ্ঞতা নিতে হবে! আধুনিক কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় যখন হলুদ ট্যাক্সি, অটো আর বাসের দাপট, তখনও কিছু জায়গায় টিকে আছে এই হাতে টানা রিকশা—একটি ঐতিহ্যের প্রতীক, যা আজও শহরের পুরনো গলিগুলোতে ছুটে চলে।
সেদিন ছিল বর্ষার এক দুপুর। কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে যখন হাঁটছিলাম, তখন চোখে পড়লো একটি হাতে টানা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি একটু একটু করে গড়িয়ে পড়ছে রাস্তার উপর, আর মাথায় গামছা বাঁধা এক চালক যাত্রী খুঁজছেন। বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম—এই রিকশায় কি চড়া উচিত? শেষ পর্যন্ত শখের বশেই উঠে পড়লাম। বসতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো—কাঠের ফ্রেম, চামড়ার মোড়ানো আসন, ওপরে ছোট একটি ছাউনি, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি কলকাতার এক শতাব্দী আগের সময়ের অংশ হয়ে গেছি।
রিকশাচালক তার হাতের শক্তিতে রিকশা টেনে নিয়ে চললেন। এই অনুভূতি সত্যিই অনন্য, কারণ এটি কোনো যান্ত্রিক বাহন নয়, বরং শুধুমাত্র একজন মানুষের শ্রম ও পরিশ্রমের ফসল। ধীর গতিতে কলকাতার পুরনো রাস্তাগুলো পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। একদিকে বইয়ের দোকানের সারি, অন্যদিকে রাস্তার ধারের ছোট চায়ের দোকানগুলো, সঙ্গে ট্রামের ধীর গতিতে এগিয়ে চলা—সব মিলিয়ে এক দারুণ নস্টালজিক পরিবেশ তৈরি করছিল।
কলকাতার এই হাতে টানা রিকশার ইতিহাস প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো। এটি প্রথম চালু হয়েছিল ১৮৮০–এর দশকে, মূলত ব্রিটিশদের জন্য। সময়ের সাথে সাথে এটি সাধারণ মানুষেরও প্রধান বাহন হয়ে ওঠে, বিশেষ করে শহরের পুরনো অংশে। একসময় শহরের বেশিরভাগ জায়গায় দেখা মিললেও, বর্তমানে এটি শুধুমাত্র বড়বাজার, কলেজ স্ট্রিট, হাতিবাগান, চিৎপুর, এন্টালি ও বউবাজারের কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ২০০৫ সালে সরকার এই রিকশা নিষিদ্ধ করতে চাইলেও, অনেক রিকশাচালকের জীবিকার কথা ভেবে এখনও কিছু এলাকায় এটি চালু রয়েছে।
রিকশায় বসে যখন চারপাশের দৃশ্য দেখছিলাম, তখন একটা বিষয় উপলব্ধি করলাম—এটি শুধুমাত্র পরিবহনের একটি মাধ্যম নয়, এটি কলকাতার প্রাণের একটি অংশ। মানুষের ব্যস্ততার মাঝে, দ্রুতগতির যানবাহনের ভিড়ে এটি যেন এক ধীর লয়ের গল্প বলে। কলকাতার যেকোনো জায়গায় ট্রাফিকের মাঝে যখন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, তখন এই হাতে টানা রিকশাগুলোই নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বর্ষার দিনে, যখন রাস্তায় জল জমে যায়, তখন এটাই একমাত্র বাহন, যা মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।
রিকশাচালকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার সুযোগ পেলাম। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। হাসিমুখে বললেন, “বাবু, আগে রিকশার চাহিদা অনেক বেশি ছিল, এখন তো সবাই গাড়িতে চলে যায়। কিন্তু পুরনো কলকাতায় এখনও আমাদের দরকার পড়ে।” তার কণ্ঠে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও, জীবনের প্রতি এক ধরনের মমতা টের পেলাম। তিনি জানালেন, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে তিনি কোনো রকমে সংসার চালান।
রিকশায় আমার যাত্রা শেষ হলো শ্যামবাজার মোড়ে গিয়ে। চালককে ভাড়া দেওয়ার পর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম, ধীরে ধীরে তিনি রিকশা নিয়ে ব্যস্ত রাস্তায় মিলিয়ে গেলেন। হয়তো ভবিষ্যতে কলকাতা আরও আধুনিক হবে, হয়তো একদিন এই ঐতিহ্যবাহী বাহন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে, কিন্তু এর স্মৃতি কখনো মুছে যাবে না। কলকাতার হাতে টানা রিকশা শুধু একটি বাহন নয়, এটি সংস্কৃতির প্রতীক, শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের গল্প, এবং সময়ের এক জীবন্ত চিহ্ন। এই রিকশায় চড়ে আমি শুধু এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাইনি, বরং কলকাতার এক হারিয়ে যেতে থাকা ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গিয়েছিলাম। এই ঐতিহ্য যতদিন থাকবে, ততদিন কলকাতার আসল রূপও বেঁচে থাকবে।